ঢাকা: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রাম এখন আর শুধু ইতিহাসের বইয়ে সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রতিফলন ঘটছে সংসদে, রাজনৈতিক সমাবেশে, টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে ও সমাজমাধ্যমে। ১৯৭১ সালের অনেক পরে জন্ম নেওয়া প্রজন্মের কাছে এ লড়াই এখন আর স্বাধীনতার জন্য নয়, বরং ঐতিহাসিক সত্যের জন্য। এ কারণেই শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের একটি নির্ভুল ও পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির বিষয়ে সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক অঙ্গীকারটি নিছক একটি প্রশাসনিক উদ্যোগের চেয়ে অনেক বেশি কিছু। এটি জাতির সম্মিলিত স্মৃতি সংরক্ষণের একটি প্রয়াস। সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী স্বীকার করেন যে স্বাধীনতার পর প্রকৃত শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের চিহ্নিত করার প্রক্রিয়াটি রাজনীতিকরণ করা হয়েছে। যাঁরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন এবং যাঁরা লড়াই করেছেন তাঁদের একটি যাচাইকৃত তালিকা তৈরির সরকারি অঙ্গীকার তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন। প্রতিটি জাতি তার বীরদের একটি নির্ভুল বিবরণ দিতে দায়বদ্ধ। যখন ইতিহাসকে রাজনীতিকরণ করা হয় তখন সত্যই তার প্রথম শিকার হয়। এ উদ্যোগটির কাল তাৎপর্যপূর্ণ। গত দুই বছরে জামায়াতে ইসলামীর নেতারা মুক্তিযুদ্ধের সময় দলটির ভূমিকা নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার বারবার চেষ্টা করেছেন। ২০২৪ সালের নভেম্বরে একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান দাবি করেন যে, জামায়াত বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধী ছিল না। বরং যে পরিস্থিতিতে এটি অর্জিত হয়েছিল তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল। তিনি আরও বলেন, একটি অবিভক্ত পাকিস্তানের জন্য জামায়াতের অবস্থান ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবস্থানের মতোই! অতি সম্প্রতি জামায়াত আমির উল্লেখ করেন যে তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধার পরিবার থেকে এসেছেন। অন্যদিকে চাঁদপুর জেলা জামায়াতের আমির বিল্লাল হোসেন মিয়াজী ঘোষণা করেন, ‘আমাদের সন্দেহের চোখে দেখবেন না। আমিও একজন মুক্তিযোদ্ধা সমর্থক ছিলাম।’ ব্যক্তিদের শুধু তাদের পারিবারিক পটভূমি বা ব্যক্তিগত পরিচয় দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোকে অবশ্যই তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাস দিয়ে বিচার করতে হবে। এখানেই জামায়াতের সমালোচকরা যুক্তি দেন যে ১৯৭১ সালে দলটি তার ভূমিকার বিষয়ে এখনো পুরোপুরি জবাবদিহি করেনি। ঐতিহাসিক বিবরণ সুস্পষ্ট। একটি রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধিতা করেছিল। একটি অবিভক্ত পাকিস্তান বজায় রাখার পক্ষে ছিল। শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদও, আলশামসের মতো সংগঠনের মাধ্যমে অসংখ্য নেতা ও কর্মী পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগিতা করেছিলেন। এ সহায়ক শক্তিগুলো মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত কিছু ভয়াবহতম নৃশংসতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। যার মধ্যে ছিল বুদ্ধিজীবীদের লক্ষ্য করে হত্যা, বেসামরিক নাগরিকদের ওপর ব্যাপক সহিংসতা, ধর্ষণ এবং সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার জন্য জামায়াত আমির মতিউর রহমান নিজামী, মহাসচিব আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে দোষী সাব্যস্ত করেন। এ দণ্ডাদেশগুলো ব্যক্তিগত ফৌজদারি দায়বদ্ধতার বিষয়টি সমাধান করলেও এগুলো ১৯৭১ সালে দলের নেতৃত্বের একাংশের ভূমিকাসংক্রান্ত প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক বিবরণকে আরও শক্তিশালী করেছে। সংসদ সম্প্রতি জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা পরিষদ (সংশোধন) আইন, ২০২৬ পাস করার মাধ্যমে সেই ঐতিহাসিক বোঝাপড়াকেই পুনর্নিশ্চিত করেছে; যা তৎকালীন জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম পার্টি, রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও শান্তি কমিটিকে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে চিহ্নিত করে চলেছে। জামায়াত এই বিধানের বিরোধিতা করেছে। অন্যদিকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সালাহউদ্দিন আহমদসহ বিএনপি নেতারা পৃথকভাবে জামায়াতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঐতিহাসিক বিরোধিতা সত্ত্বেও নিজেদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টার অভিযোগ করেছেন। রাজনৈতিক দলগুলো বিবর্তিত হতে পারে। গণতন্ত্রে আদর্শগত রূপান্তর এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ থাকা উচিত। কিন্তু প্রকৃত মীমাংসা সততার মাধ্যমেই শুরু হয়। কোনো গণতান্ত্রিক সমাজই তার অতীতের বেদনাদায়ক অধ্যায়গুলো নতুন করে লিখে নিজেকে শক্তিশালী করে না। ঐতিহাসিক জবাবদিহিতা মানে চিরস্থায়ী শাস্তি নয়; এর অর্থ হলো নথিভুক্ত সত্যকে স্বীকার করে নেওয়া। এ বিষয়টি বিশেষ করে তরুণ বাংলাদেশিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আজকের অধিকাংশ ভোটারই ১৯৭১ সালের ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করেননি। তাদের উচিত রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের নীতি, যোগ্যতা এবং ভবিষ্যৎ রূপকল্পের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা। তবু সচেতন গণতান্ত্রিক পছন্দের জন্য এও বোঝা প্রয়োজন যে দলগুলো তাদের নিজেদের ইতিহাস কীভাবে উপস্থাপন করে। যে রাজনৈতিক সংগঠন সুপ্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক সত্য স্বীকার করতে সংগ্রাম কওে, তা অনিবার্যভাবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রতি তার অঙ্গীকার নিয়ে প্রশ্ন তোলে। সুতরাং শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের একটি নির্ভুল তালিকা প্রশাসনিক নির্ভুলতার চেয়েও বেশি কিছু অর্জন করবে। এটি বাংলাদেশের ইতিহাস বিকৃতি থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করবে এবং নিশ্চিত করবে যে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক আখ্যানের পরিবর্তে প্রকৃত সত্য উত্তরাধিকার সূত্রে পাবে। সুতরাং শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের একটি নির্ভুল তালিকা কেবল প্রশাসনিক নির্ভুলতার চেয়েও বেশি কিছু অর্জন করবে। এটি বাংলাদেশের ইতিহাস বিকৃতি থেকে রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক বয়ানের পরিবর্তে প্রকৃত সত্য পায়, তা নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে। যে প্রজন্ম স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছিল, তারা ধীরে ধীরে মশাল হস্তান্তর করছে। ১৯৭১ সালের সত্য রক্ষা করার দায়িত্ব এখন ক্রমবর্ধমানভাবে তাদের ওপরই বর্তাচ্ছে, যারা সেই সময়ের সাক্ষী ছিল না। বাংলাদেশিরা ক্ষমা, গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতা এবং রাজনৈতিক নবায়নে বিশ্বাস রাখতে পারে। কিন্তু সেই মূল্যবোধগুলো ঐতিহাসিক সত্যের বিনিময়ে আসতে পারে না। যতক্ষণ না জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তাদের প্রাতিষ্ঠানিক বিরোধিতাকে দ্ব্যর্থহীনভাবে স্বীকার করছে এবং কোনো দ্বিধা ছাড়াই সেই ইতিহাসের মুখোমুখি হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত বহু বাংলাদেশি এ প্রশ্ন তুলতেই থাকবে যে দলটি তাদের আস্থা অর্জন করতে পেরেছে কি না?























































Discussion about this post