স্পোর্টস ডেস্ক: শুরু থেকেই ম্যাচটা যেন নিয়ন্ত্রণ করছিল নরওয়ে। ব্রাজিলের সঙ্গে বল পজেশন ধরে রেখে সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন আর্লিং হলান্ড, মার্টিন ওডেগার্ডরা। নিজেদের রক্ষণ ঠিক রেখে আক্রমণে উঠেছেন সুযোগ বুঝে। তবুও ব্রাজিল সুযোগ পেয়েছিল এগিয়ে যাওয়ার। কিন্তু গোল মিসের মহড়ায় নাম লেখান কার্লো আনচেলত্তির শিষ্যরা। অন্যদিকে ঠান্ডা মাথায় হলান্ড ঐতিহাসিক জয় ছিনিয়ে আনেন নরওয়ের জন্য। রোববার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে ব্রাজিলকে ২-১ গোলে হারিয়েছে নরওয়ে। প্রথমার্ধে গোলশূণ্য থাকার পর দ্বিতীয়ার্ধে নরওয়ের হয়ে দুটি গোলই করেন আর্লিং হলান্ড। বিশ্বকাপে এ নিয়ে লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপের সমান সাতটি গোল করলেন ম্যানচেস্টার সিটির তারকা। শেষ দিকে বদলি নামা নেইমার জুনিয়র পেনাল্টি থেকে এক গোল পরিশোধ করেন। যদিও তাতে কেবল ব্যবধানই কমেছে। ব্রাজিলের হেক্সা মিশন থেমেছে শেষ ষোলোতেই। ১৯৯০ সালের পর এই প্রথম কোয়ার্টারের আগে বাদ পড়ল ব্রাজিল। এই প্রথম বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠল নরওয়ে। ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরে ইতিহাসই রচনা করল ইউরোপের দলটি। এর আগে তারা ১৯৩৮ এবং ১৯৯৮ বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ শেষ ষোলোয় উঠেছিল। সেই সঙ্গে ব্রাজিলের সঙ্গে অপরাজিত থাকার রেকর্ডও ধরে রাখল দ্য ভাইকিংরা। নরওয়ের বিপক্ষে আগের চার দেখায় একবারও জিততে পারেনি ব্রাজিল। ম্যাচ শুরুর কয়েকদিন আগে থেকে বোধকরি সবচেয়ে বেশি আলোচনা ছিল এ নিয়ে। ব্রাজিল কি এবার পারবে নরওয়েজিয়ানদের বিপক্ষে প্রথম জয় তুলে নিতে? নাকি আরও একবার জয়হীন থাকবে তারা। শেষ পর্যন্ত আশঙ্কাই সত্যি হলো, নরওয়ের বিপক্ষে আরেকটি দেখায় হেরে মাঠ ছাড়ল সেলেসাওরা।ম্যাচের তৃতীয় মিনিটে ব্রাজিলের জাল কাঁপিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে নরওয়ে। যদিও সরলথের ভুলের জন্য অফসাইডে গোল পায়নি তারা। এরপর এগিয়ে যাওয়ার প্রথম সুযোগ পেয়েছিল ব্রাজিলই। দশম মিনিটে কুনিয়াকে ফাউল করেন ক্রিস্টোফার ভাসবাক আয়ের। ভিএআর-এ রেফারি সিদ্ধান্ত দেন পেনাল্টির। কিন্তু স্পট কিকে গিমারায়েসকে বাম দিকে ঝাঁপিয়ে আটকে দেন নরওয়ের গোলকিপার অরিয়ান হাস্কিয়োল্ড নাইল্যান্ড। শুরু ১৪ মিনিট রোমাঞ্চকর হলেও পরের ১০ মিনিট নির্লিপ্ত ফুটবলই খেলেছে নরওয়ে। নিজেদের পায়ে বল পজিশন ধরে রাখলেও আক্রমণে সেভাবে ওঠার তাড়া করেনি দলটি। ভিনিসিয়ুস-গিমারায়েসরা দু-একবার বল পেয়ে উপরে উঠতে চেষ্টা করলেও নরওয়েজিয়ান শক্তিমান ডিফেন্ডারদের সঙ্গেই যেন তারা পেরে উঠছিলেন না। প্রথমার্ধের হাইড্রেশন ব্রেকের পর গোলের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে ব্রাজিল। প্রতিপক্ষের রক্ষণে একের পর এক হানা দিতে থাকে সেলেসাওরা। ৩১ মিনিটে বাম পোস্টের কোনা থেকে মার্টিনেল্লির নিচু শট ঠেকিয়ে দেন নরওয়ের গোলকিপার। এসময় কম যায়নি নরওয়েও। ব্রাজিলের পোস্টে আঘাত হানার চেষ্টা করেছে দলটি। যদিও পরপর দুটি শটের একটি বাইরে মাইরে নুসা, অন্যটিতে হলান্ডের শট সহজেই গ্লাভসবন্দি করেন আলিসন বেকার।৪০ মিনিটে কয়েকজনকে কাটিয়ে শট নেন ভিনিসিয়ুস, প্রতিপক্ষের গোলকিপার হাটু দিয়ে ঠেকিয়ে দেওয়ার পর বল বাম পোস্টে লেগে বাইরে চলে যায়। যোগ করা সময়ের তৃতীয় মিনিটে প্রায় নিশ্চিত গোল ঠেকিয়ে দেন আলিসন বেকার। প্রতিপক্ষের দুই ডিফেন্ডারের বাধা টপকে হলান্ড বল দেন ওডেগার্ডকে। নরওয়ের অধিনায়ক পোস্টের মাঝ বরাবর শট নিলে আটকে দেনে বেকার। খানিক পর রায়ানের দুর্দান্ত ক্রসে ফাঁকায় থাকা মার্টিনেল্লি বলে মাথা ছোঁয়াতেই পারেননি। বিরতির পর খেলার গতি কিছুটা কমে। কুনিয়ার বদলি হিসেবে এন্দ্রিককে নামান কোচ আনচেলত্তি। মাঠে নামার পর বলে প্রথম টাচেই ম্যাচের সবচেয়ে বড় সুযোগটা মিস করেন এন্দ্রিক। ৫৯ মিনিটে মধ্য মাঠ থেকে রক্ষণচেড়া পাস বাড়ান ভিনিসিয়ুস, থ্রু বল ধরে বক্সে ঢুকে পড়েন এন্দ্রিক, কিন্তু একা গোলকিপারকে পেয়েও এই ফরোয়ার্ড বল মারেন পোস্টের বাইরে দিয়ে। তিন মিনিট পর রায়ানের দুর্দান্ত শট আটকে দেন নরওয়ের গোলকিপার। ৬৭ মিনিটে ভাসবাক আয়েরের দারুণ ক্রসে বলে পাঁ ছোয়াতে পারেননি হলান্ড। পরের মিনিটে নেইমারকে বদলি হিসেবে নামান ব্রাজিল কোচ। এবারের বিশ্বকাপে এই দ্বিতীয়বার মাঠে নামেন ব্রাজিলিয়ান তারকা। ৭৫ মিনিটে দুর্দান্ত সেভ করে ব্রাজিলকে আরও একবার বাঁচিয়ে দেন আলিসন বেকার। তবে ৭৯ মিনিটে হলান্ডকে আর ফেরাতে পারেননি ব্রাজিলিয়ান গোলকিপার। বাম পাশ ধরে উপরে উঠে বক্সে ক্রস দেন বদলি খেলোয়াড় আন্দ্রেয়াস শেলদেরুপ। মাপা ক্রস পেয়ে লাফিয়ে উঠে হেডে জাল কাঁপান হলান্ড। এগিয়ে যায় তাঁর দল।৮৫ মিনিটে পরপর দুবার সুবর্ণ সুযোগ হারায় ব্রাজিল। এরপরই ব্রাজিলের ম্যাচে ফেরার সম্ভাবনা ক্ষীণ করে দেন হলান্ড। ৯০ মিনিটে আন্দ্রেস শেলদেরুপের পাসে ডি বক্সের একটু বাইরে ফাঁকায় বল পেয়ে যান হলান্ড। বাম পায়ের জোরাল শটে জাল কাঁপান তিনি। ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়া ব্রাজিলের হাতে ম্যাচে ফেরার জন্য তখন যোগ করা সময়ের ৮ মিনিট। ব্রাজিল কি পারবে ঘুরে দাঁড়াতে? সময় যত গড়িয়েছে হতাশা ততই বেড়েছে হলুদ জার্সিধারীদের। শেষ পর্যন্ত একটু আশার আলো দেখে ব্রাজিল, যদিও সময় ততক্ষণে গড়িয়েছে অনেকটাই, অন্তিম মুহূর্তে পেনাল্টি পায় ব্রাজিল। কিন্তু স্পট কিকে পাওয়া নেইমারের ওই গোল কেবল আক্ষেপই বাড়িয়েছে সেলেসাও সমর্থকদের। আরও আগে নামলে হয়ত শুরুতে পাওয়া আরেকটি পেনাল্টি থেকে দলকে এগিয়ে দিতেন তিনি! শেষ পর্যন্ত ব্রাজিল সমর্থকরাও কী এই আক্ষেপ নিয়েই মাঠ ছাড়লেন- কোচ আনচেলত্তি কি তাঁর ‘সেরা অস্ত্র’ নেইমারকে মাঠে নামাতে বড্ড বেশি দেরি করে ফেললেন! বিশ্বকাপে ব্রাজিলের হেক্সা পুরণ আরও দীর্ঘায়িত হলেও নরওয়ে কিন্তু ইতিহাস রচনা করে ফেলেছে। ম্যাচ শেষে মাঠে আসা নিজ দেশের সমর্থকদের সঙ্গে এক সঙ্গে গান গেয়ে হাসিমুখে মাঠ ছাড়লেন হলান্ডরা। তাদের সমর্থকেরাও যেন দেশের এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি উপভোগ করতে চাইলেন আরও বেশি সময় ধরে। মাঠে এ উৎযাপন খুব বেশি দীর্ঘায়িত না হলেও দেশটিতে আজ নিশ্চিত উল্লাস চলবে সারা রাত ধরে।























































Discussion about this post