বিশেষ প্রতিনিধি: সিলেটে আলোচিত ট্রিপল মার্ডারের ঘটনায় আটক আসামি বাবুল মিয়ার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছোরা উদ্ধার করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) সকালে রায়নগরের একটি খালি প্লটে তল্লাশি চালিয়ে ছোরাটি উদ্ধার করা হয়। বুধবার সকালে নগরীর রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসার দোতলায় এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। বাসার ভেতরে ঢুকে স্বামী-স্ত্রী ও গৃহপরিচারিকাকে কুপিয়ে এবং গলা কেটে হত্যা করা হয়। নিহতরা হলেন ওই এলাকার বাসিন্দা আব্দুস সাত্তার (৮২), তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭২) ও গৃহপরিচারিকা তাহমিনা আক্তার (২০)। তাহমিনা নগরীরর জল্লারপাড়া এলাকার বাসিন্দা আফতাব মিয়ার মেয়ে। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) উপপুলিশ কমিশনার (উত্তর ও প্রসিকিউশন) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও আলামত উদ্ধারের বিষয়ে গণমাধ্যমকে এসব তথ্য জানান। তিনি জানান, উদ্ধার করা ছোরাটি ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য প্রেরণ করা হবে। এতে থাকা রক্তের নমুনার সঙ্গে ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা রক্তের নমুনা মিলিয়ে দেখা হবে। এর মাধ্যমে ছোরায় থাকা রক্ত কার, তা নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করা হবে। মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল মিয়া জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডের পর রায়নগরের একটি খালি জায়গায় ছোরাটি ফেলে দেন তিনি। বুধবার (১২ আগস্ট) সন্ধ্যায় ওই এলাকায় তল্লাশি চালালেও ছোরাটির সন্ধান পাওয়া যায়নি। বৃহস্পতিবার সকালে শ্রমিক নিয়ে ফের তল্লাশি চালালে ছোরাটি উদ্ধার করে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল মিয়া যে ধরনের ছোরার কথা বলেছিলেন, উদ্ধার হওয়া ছোরাটির সঙ্গে তার মিল আছে জানিয়ে উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ বাবুল মিয়া রঙমিস্ত্রির পাশাপাশি কসাইয়ের কাজ করেন। আটকের পর তিনি পুলিশকে জানিয়েছিলেন, ছোরাটি ছয় থেকে সাত ইঞ্চি লম্বা ও কাঠের হাতলযুক্ত হতে পারে। উদ্ধার করা ছোরাটির সঙ্গে এ বর্ণনার যথেষ্ট মিল পাওয়া গেছে। তবে ফরেনসিক পরীক্ষা ও অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে। প্রাথমিকভাবে পুলিশ ধারণা করছে, ঘটনাস্থলের আলামত বিশ্লেষণ করে হত্যাকাণ্ডের পর ছোরাটি ধুয়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল। বাসার বেসিন ও হাত ধোয়ার স্থানে রক্তের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ছোরার ধাতব অংশেও শুকনো রক্তের দাগ রয়েছে। একটি ব্যাগেও রক্তের দাগ পাওয়া গেছে।’ পুলিশের এই কর্মকর্তা জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল মিয়া জানিয়েছেন, রং করার কাজ করতে গিয়ে গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে তার পরিচয় ও যোগাযোগ হয়। তাদের সম্পর্ক প্রেমের পর্যায়ে গিয়েছিল কিনা, সেটি জানাননি বাবুল। এর মধ্যে গৃহকর্মীর কোনো আচরণে বাবুল ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। ওই ক্ষোভ থেকেই গৃহকর্মীকে হত্যা করতে তিনি ছুরি নিয়ে বাসায় গিয়েছিলেন। হত্যাকাণ্ডের বিবরণ দিতে গিয়ে তিনি জানান, প্রথমে গৃহকর্মীকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। তাকে রক্ষা করতে গৃহকর্ত্রী এগিয়ে এলে তার সঙ্গে বাবুল মিয়ার ধস্তাধস্তি হয়। পরে গৃহকর্তা এগিয়ে এলে তাকেও ছুরিকাঘাত করা হয়। এরপর বারান্দা দিয়ে পালিয়ে যান বাবুল মিয়া। ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে পুলিশ বাসায় প্রবেশের সময় দরজার নিচের ছোট ছিটকানি ভাঙা অবস্থায় পেয়েছে। বাবুল মিয়া যে বারান্দা দিয়ে পালানোর কথা জানিয়েছেন, সেখানকার রেলিংয়ে হাতের ছাপ ও পায়ের ছাপ আছে। নিচেও রক্তের চিহ্ন আছে। তবে বাবুল মিয়া ছাড়া অন্য কেউ ওই বাসায় প্রবেশ করেছিলেন কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে, হত্যাকাণ্ডের পর বাসার কয়েকটি ওয়ারড্রোব ও আলমারি খোলা অবস্থায় পাওয়া গেছে। তবে সেসব ভাঙা ছিল না। সেখান থেকে কোনো মূল্যবান জিনিস খোয়া গেছে কি না, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানাতে পারেনি পুলিশ। এদিকে, ঘটনাস্থল থেকে তিন পাতার একটি দলিলসদৃশ কাগজ উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, উদ্ধার দলিলসদৃশ কাগজটি মূল দলিল নয়; সম্ভবত ফটোকপি বা অনুলিপি। এর সঙ্গে কোনো মামলা কিংবা সম্পত্তিসংক্রান্ত বিরোধের যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখছে পুলিশ। পুলিশ জানায়, বাবুল মিয়া আগে ওই বাসায় রং করার কাজ করেছেন। এর ফলে বাসা এবং ঘরের ভেতরের পরিবেশ ও বিভিন্ন জিনিসপত্র সম্পর্কে ধারণা ছিল তার। দীর্ঘদিন ধরে বাসাভাড়া পরিশোধ করতে পারছিলেন না তিনি। হত্যাকাণ্ডের পর তিনি বাসাভাড়া পরিশোধ করেছে কি না এবং ঘটনার পর কোথায় কোথায় গিয়েছিলেন, সেসব বিষয়ও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম মামলার বিষয়ে জানান, নিহত দম্পতির প্রবাসী সন্তানরা দেশে এসে আইনজীবী ও স্বজনদের মাধ্যমে এজাহার দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এজাহার পাওয়া গেলে সেটি মামলা হিসেবে রেকর্ড করা হবে এবং আটক বাবুলকে আদালতে হাজির করা হবে। জানা গেছে, বুধবার সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ওই এলাকায় লোডশেডিং চলাকালে এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সংগঠিত হয়। নিহতদের বাসা ও পুরো এলাকা সিসি ক্যামেরার আওতায় থাকলেও লোডশেডিংয়ের কারণে কোনো ফুটেজ ধরা পড়েননি খুনি। এছাড়া বাসার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে কাউকে দেখা যায়নি। তবে যে গলি দিয়ে খুনি পালিয়ে গিয়েছিলেন, সেখানের সিসিটিভির ফুটেজ দেখে তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় বাবুলকে শনাক্ত করে আটক করে পুলিশ। পরে সেদিন রাতে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) উপকমিশনার (উত্তর) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, সিসিটিভির ফুটেজ দেখেই খুনিকে শনাক্ত করতে পারে পুলিশ। তখন বাসার সিসিটিভির ফুটেজের কথা গোপন রাখা হয়েছিল, কারণ এতে করে খুনি এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। বাসার তিনটি কক্ষে তিনটি সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল। এর মধ্যে একটির সিসিটিভির ক্যামেরা অকেজো করে দিয়েছিলেন খুনি। বাকি দুটির ফুটেজ দেখে তাকে শনাক্ত করা হয়েছে। ওই ফুটেজের সূত্র ধরেই ৬ ঘণ্টার মধ্যে তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় পুলিশ। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আব্দুস সাত্তার দম্পতি মিতালী আবাসিক এলাকার বাসিন্দা। পেশায় ব্যবসায়ী হলেও আওয়ামী লীগের একজন পুরনো কর্মী হিসেবে মহল্লায় পরিচিত। তবে বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর তিনি নিষ্ক্রিয় ছিলেন। তাদের এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। তারা উভয়ই সপরিবারে লন্ডনে থাকেন।























































Discussion about this post