ঢাকা: ‘সামাজিক সুরক্ষা শুধু অর্থনৈতিক চাহিদা নয়, এটি একটি নৈতিক দায়িত্ব। একটি মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে এবং স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের প্রস্তুতিতে বাংলাদেশকে অবশ্যই এমন একটি সর্বজনীন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যা সবার মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।’গতকাল সোমবার রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলনকেন্দ্রে একটি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ এসব কথা বলেন। ‘সমতাভিত্তিক সমাজের পথে যাত্রা’—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে নিয়ে তিন দিনের জাতীয় সামাজিক সুরক্ষা সম্মেলন-২০২৫ এই সম্মেলনটি আয়োজন করে সরকারের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।এতে কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) বাংলাদেশের সোশ্যাল সিকিউরিটি পলিসি সাপোর্ট (এসএসপিএস) প্রোগ্রাম এবং অর্থায়নে অস্ট্রেলিয়া সরকারের ডিপার্টমেন্ট অব ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড ট্রেড (ডিএফএটি)। সম্মেলনে নীতিনির্ধারক, উন্নয়ন সহযোগী, শিক্ষাবিদ ও সিভিল সোসাইটি নেতারা অংশ নিচ্ছেন।ওয়াহদিউদ্দনি মাহমুদ বলেন, দেশে বিপুলসংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যসীমার ঠিক ওপরে অবস্থান করছেন, যারা সামান্য ধাক্কায় দরিদ্র হয়ে পড়তে পারেন। তিনি বলেন, ‘কিছু মানুষ নাক বরাবর পানিতে দাঁড়িয়ে আছেন, সামান্য ঢেউ এলেই তলিয়ে যাবেন।’ন্যায্যতাভিত্তিক সমাজে চরম দারিদ্র্য থাকতে পারে না উল্লেখ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, কোনো দেশ এত গরিব হতে পারে না যে তার সব মানুষের জন্য সে অন্তত জীবনধারণের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারবে না। এখন তো আমাদের কোনো অজুহাত দেখালে চলবে না যে আমরা সবাইকে ন্যূনতম সামাজিক নিরাপত্তা দিতে পারব না।ফলে এই দারিদ্র্য দূর করা আমাদের অন্যতম মূল উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। সেই সঙ্গে এটিকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করতে এখন থেকেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে।’সামাজিক ভাতা দেওয়ার ক্ষেত্রে উপকারভোগী নির্ধারণে বড় সমস্যা আছে উল্লেখ করে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, বর্তমানে যারা ভাতা পান, তাঁদের ৫০ শতাংশই এ সুবিধা পাওয়ার যোগ্য নন। তারা ভুতুড়ে অথবা রাজনৈতিক বিবেচনায় সুবিধা পাচ্ছেন। জাতীয়ভাবে সমন্বিত তালিকা তৈরি করা ও মাঠপর্যায়ে তদারকি করা গেলে প্রকৃত উপকারভোগী ও যোগ্যদের নাম বের হয়ে আসবে।সমতাভিত্তিক রাষ্ট্রে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি সবাইকে বাঁচার জন্য ন্যূনতম যা দরকার, তা দিতে হবে। যার জীবনধারণের কোনো উপায় নেই, তাঁকে বিদ্যালয় বা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র দিয়ে তো লাভ নেই। সেগুলো গ্রহণ করার মতো অবস্থায় তিনি নেই। কাজেই এ দুটি বিষয় অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার মূল্যবোধ ও গত বছরের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানেরও সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল সাম্যভিত্তিক সমাজ গড়া। সবার আয় সমান হবে না; কিন্তু সুযোগ সমান থাকতে হবে।পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, দেশে কিছু দারিদ্র্যঘন এলাকা আছে। রংপুর একসময় মৌসুমি দারিদ্র্যঘন এলাকা ছিল। এই মৌসুমি দারিদ্র্য মঙ্গা হিসেবে পরিচিত। ২০০৩-০৫ সালের দিকে মঙ্গা নিয়ে গণমাধ্যমে অনেক আলোচনা হয়েছে। আগে তো সরকার মঙ্গার কথা অস্বীকার করত।দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা বীর প্রতীক ফারুক-ই-আজম বলেন, ‘অভিযোজনযোগ্য ও শক-রেসপন্সিভ সামাজিক সুরক্ষা কোনো বিকল্প নয়; এটি স্থিতিশীলতার ভিত্তি। বাংলাদেশে সামাজিক সুরক্ষার যাত্রা শুরু হয়েছিল দুর্যোগ মোকাবেলা থেকেই, আর আজও দুর্যোগ-সহনশীল কমিউনিটি গড়ে তোলাই সবচেয়ে শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষা।’ইউএনডিপি বাংলাদেশের আবাসিক প্রতিনিধি স্টেফান লিলার বলেন, ‘আমাদের বুঝতে হবে, সামাজিক সুরক্ষা কোনো দয়া নয়, এটি একটি অধিকার এবং রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে সামাজিক চুক্তির স্তম্ভ। বাংলাদেশ যখন আগামী প্রজন্মের কৌশল নির্ধারণ করছে, তখন আমরাও বাংলাদেশের পরিবর্তিত সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে অবদান রাখতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।’উদ্বোধনী অধিবেশনের সভাপতিত্ব করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. শেখ আবদুর রশিদ। অনুষ্ঠানে স্বাগত ভাষণ দেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সমন্বয় ও সংস্কার সচিব জাহেদা পারভীন। এ সময় ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রতিনিধি দলের সহযোগিতা বিষয়ক প্রধান মিকাল ক্রেইজা, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সচিব) মনজুর হোসেন এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মো. মখলেসুর রহমানসহ আরও অনেকে বক্তব্য দেন।






















































Discussion about this post