স্পোর্টস ডেস্ক: অনেক দিক থেকে দেখলে, বিষয়টি আসলে পুরোপুরি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর দোষ নয়। যখন বছরের পর বছর আপনাকে বলা হয় আপনি এখনো আগের মতোই সেরা, যখন কোচ আপনাকে নিয়মিত একাদশে রাখেন, যখন হাজারো দর্শক শুধুমাত্র আপনাকে দেখার জন্য স্টেডিয়ামে আসে, তখন নিজের সামর্থ্য সম্পর্কে বিশ্বাস হারানো কঠিন। বরং স্বাভাবিকভাবেই মনে হবে, সেই পুরোনো জাদু এখনো কোথাও রয়ে গেছে। কিন্তু ফুটবল শেষ পর্যন্ত অনুভূতির নয়, বাস্তবতার খেলা। আর বাস্তবতা বলছে, রোনালদো আর আগের রোনালদো নন। হিউস্টনে ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে পর্তুগালের ১-১ গোলে ড্রয়ের ম্যাচটি ছিল সেই বাস্তবতার আরেকটি নির্মম স্মারক। এক ঘণ্টারও বেশি সময় মাঠে থেকেও ম্যাচে তার প্রভাব ছিল প্রায় অদৃশ্য। এমন নয় যে তিনি ভয়াবহ খেলেছেন। বরং সমস্যা ছিল অন্য জায়গায়—তিনি যেন খেলাতেই ছিলেন না। পুরো ম্যাচে রোনালদোর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মুহূর্ত ছিল বিরতির পর পাওয়া দুটি সুযোগ। দুটিই কাছের পোস্ট ঘেঁষে বাইরে চলে যায়। প্রথমটি কঠিন সুযোগ ছিল, দ্বিতীয়টিতে তিনি বল ছেড়ে দিলে পেছনে থাকা ব্রুনো ফার্নান্দেস আরও ভালো অবস্থানে শট নিতে পারতেন। ফক্স স্পোর্টসে ম্যাচ বিশ্লেষণে সাবেক ফরাসি কিংবদন্তি থিয়েরি অঁরি মন্তব্য করেছিলেন, “দলের গোল দরকার। গোলটা তোমাকেই করতে হবে এমন নয়।” ইঙ্গিতটা ছিল স্পষ্ট—রোনালদো যেন দলের প্রয়োজনের চেয়ে নিজের গোলের হিসাবেই বেশি মনোযোগী ছিলেন। এরপর ম্যাচে তার অবদান প্রায় শূন্য। একসময় যেসব ক্রসে তিনি অবিশ্বাস্য উচ্চতায় লাফিয়ে হেড করতেন, সেসব পরিস্থিতিতেও এবার তাকে নিষ্ক্রিয় দেখা গেছে। একটি দারুণ ক্রস দূরের পোস্টে ভেসে এলে তিনি লাফ দেওয়ার চেষ্টাও করলেন না। শেষ পর্যন্ত সহজেই বল ক্লিয়ার করে দেন চান্সেল এমবেমবা। একসময় প্রতিপক্ষের জন্য আতঙ্কের নাম ছিলেন রোনালদো। এখন তিনি বেশি পরিচিত নিজের অতীতের জন্য। ৪১ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ডকে মাঠে রাখার সবচেয়ে বড় যুক্তি হলো, তিনি এখনো প্রতিপক্ষের মনোযোগ নিজের দিকে টেনে নিতে পারেন। বিবিসির বিশ্লেষণে সাবেক ইংলিশ তারকা ওয়েইন রুনি বলেছিলেন, রোনালদোর অফসাইড অবস্থানে থাকা অনেক সময় প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করে এবং সতীর্থদের জন্য জায়গা তৈরি করে। কিন্তু সমস্যা হলো, সেই ফাঁকা জায়গা তৈরি করলেও রোনালদো নিজে আর আগের মতো হুমকি হয়ে উঠতে পারছেন না। ডিআর কঙ্গোর মিডফিল্ডার এনগালায়েল মুকাউও ম্যাচ শেষে পরোক্ষভাবে সেটিই স্বীকার করেন। তার ভাষায়, রোনালদো আর আগের মতো দৌড়ান না এবং বয়সের প্রভাব তার খেলায় স্পষ্ট। তবু পর্তুগাল কোচ রবার্তো মার্টিনেজ তার সিদ্ধান্তের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন। ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, “যে ম্যাচে আমাদের গোল দরকার, সেখানে ফুটবল ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতাকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়ার কোনো অর্থ হয় না।” সেখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দটি ছিল—‘ইতিহাস’। কারণ রোনালদো এখন অনেকটাই ইতিহাসের অংশ। অতীতের এক মহাকাব্যিক অধ্যায়, যা আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়, কিন্তু মাঠের বাস্তবতায় যার প্রভাব ক্রমেই কমে আসছে। ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল বড় টুর্নামেন্টে রোনালদোর টানা দশম গোলশূন্য ম্যাচ। এমন একজন ফুটবলারকে যদি বেঞ্চের অভিজ্ঞ নেতা, বিশেষ পরিস্থিতির বিকল্প কিংবা পেনাল্টি বিশেষজ্ঞ হিসেবে ব্যবহার করা হতো, তাহলে হয়তো প্রশ্ন কম উঠত। কিন্তু পর্তুগালের মতো প্রতিভায় ভরা দলের প্রধান আক্রমণভাগের ভরসা হিসেবে তাঁকে ব্যবহার করার যৌক্তিকতা দিন দিন দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে বড় বৈপরীত্যটি ধরা পড়ে বিশ্বকাপের অন্য ম্যাচগুলোর দিকে তাকালে। সেদিন নরওয়ের হয়ে আর্লিং হাল্যান্ড করেছেন জোড়া গোল। ফ্রান্সের হয়ে কিলিয়ান এমবাপ্পে করেছেন দুটি গোল। আর আর্জেন্টিনার হয়ে লিওনেল মেসি তুলে নিয়েছেন দুর্দান্ত হ্যাটট্রিক। অন্যদিকে রোনালদো ছিলেন প্রায় অদৃশ্য। ম্যাচ শেষে শেষ বাঁশি বাজার পর তিনি ধীরে ধীরে টানেলের দিকে হাঁটলেন। সতীর্থরা তখন সমর্থকদের অভিনন্দন জানাচ্ছিলেন। রোনালদো চলে গেলেন একা, নিঃশব্দে। হয়তো সেটি ইচ্ছাকৃত ছিল না। কিন্তু দৃশ্যটি যেন পুরো গল্পেরই প্রতীক। এটা পুরোপুরি তার দোষ নয়। কেউই সহজে মেনে নিতে পারে না যে সময় তাকে পেছনে ফেলে এসেছে। কিন্তু ফুটবল খুব কম ক্ষেত্রেই আবেগের কাছে মাথা নত করে। আর নিষ্ঠুর সত্য হলো—ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো আর পারছেন না।
























































Discussion about this post