আন্তর্জাতিক ডেস্ক: পরিবার নিয়ে শিগগিরই ব্রিটেনে ফিরছেন প্রিন্স হ্যারি। এর মধ্য দিয়ে তার ঘটনাবহুল জীবনে নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে। রাজপরিবারের সঙ্গে বিরোধ, নিরাপত্তা নিয়ে আইনি লড়াই এবং ব্রিটিশ ট্যাবলয়েডগুলোর বিরুদ্ধে মামলা—সব মিলিয়ে এমন প্রত্যাবর্তন একসময় ছিল অকল্পনীয়। ৪১ বছর বয়সী হ্যারি রাজপরিবারের কঠোর নিয়মকানুনের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই মানিয়ে নিতে পারেননি। একসময় তাকে ‘রাগী তরুণ’ ও ‘প্লেবয় প্রিন্স’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হতো। সেই পরিচয় পেছনে ফেলে শেষ পর্যন্ত নিজের ঘনিষ্ঠ স্বজনদের সঙ্গেই বিরোধে জড়িয়ে পড়েন তিনি। লন্ডন থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে। ছয় বছর আগে স্ত্রী মেগান মার্কেলকে সঙ্গে নিয়ে ব্রিটেন ছেড়ে ক্যালিফোর্নিয়ায় পাড়ি জমান হ্যারি। এবার দেশে ফিরলেও সিংহাসনের উত্তরাধিকারী বড় ভাই উইলিয়াম ও তার স্ত্রী প্রিন্সেস ক্যাথরিনের সঙ্গে তার সম্পর্ক এখনো স্বাভাবিক হয়নি। তবে ক্যানসারের সঙ্গে লড়াইরত বাবা রাজা তৃতীয় চার্লসের সঙ্গে হ্যারির সম্পর্কের উন্নতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে স্বেচ্ছানির্বাসনের অবসান ঘটিয়ে দেশে ফেরার পর পারিবারিক সম্পর্ক কতটা পুনর্গঠিত হবে, সেটিই এখন নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। রাজপরিবারের ইতিহাসবিদ এড ওওয়েন্স এএফপিকে বলেন, ‘আমি মনে করি, এই ফিরে আসার অন্যতম কারণ হলো রাজার সঙ্গে এবং বৃহত্তর রাজপরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন।’ তিনি বলেন, ‘সেই ক্ষতগুলো যদি সারিয়ে তোলা না যায়, তাহলে শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ওপর নয়, প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তির ওপরও এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।’ এই বিরোধ রাজপরিবারের ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। রাজপরিবারকে বর্ণবাদ ও নিপীড়নের মতো বিভিন্ন অভিযোগের মুখোমুখি হতে হয়েছে। এতে ব্রিটেনের তরুণ ও আরও বৈচিত্র্যময় প্রজন্মের কাছে রাজপরিবারের গ্রহণযোগ্যতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ব্রিটেনে হ্যারি ও মিশ্র বর্ণের মেগানের ভাবমূর্তি অত্যন্ত বিভাজন সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা গেছে, কেলেঙ্কারিতে জর্জরিত হ্যারির চাচা সাবেক প্রিন্স অ্যান্ড্রু ছাড়া অন্য যেকোনো রাজপরিবারের সদস্যের তুলনায় তাদের নিয়ে নেতিবাচক মত বেশি। রাজপরিবারবিষয়ক বিশেষজ্ঞ রিচার্ড ফিটজউইলিয়ামস এএফপিকে বলেন, ‘ব্রিটেনে আস্থার ঘাটতির বিষয়টি তাদের মেনে নিতে হবে। তারা ব্রিটেন এবং রাজপরিবার সম্পর্কে বেশ কিছু কঠোর কথা বলেছেন।’ একসময় ব্রিটেনের অন্যতম জনপ্রিয় রাজপরিবারের সদস্য ছিলেন হ্যারি। সামরিক বাহিনী ও দাতব্য কর্মকাণ্ডে তিনি ছিলেন অগ্রগামী। তার উজ্জ্বল লাল চুল ও বিদ্রোহী স্বভাবও তাকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছিল। তবে শৈশবে মা প্রিন্সেস ডায়ানাকে হারানোর গভীর আঘাত তার জীবনের বড় অংশজুড়েই তাকে তাড়া করেছে। ২০১৭ সালে ‘দ্য টেলিগ্রাফ’কে হ্যারি বলেছিলেন, ‘গত ২০ বছর ধরে আমার সব আবেগ বন্ধ করে রাখার বিষয়টি শুধু আমার ব্যক্তিগত জীবনেই নয়, কাজেও বেশ গুরুতর প্রভাব ফেলেছে।’ হেনরি চার্লস অ্যালবার্ট ডেভিড ১৯৮৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর সিংহাসনের উত্তরাধিকারের তালিকায় তৃতীয় হিসেবে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৯৭ সালে মায়ের কফিনের পেছনে মাথা নিচু করে পাথরের মতো মুখে হাঁটা ১২ বছর বয়সী হ্যারির ছবি বিশ্বজুড়ে মানুষের সহানুভূতি কুড়িয়েছিল। তিনি অভিজাত আবাসিক স্কুল ইটনে পড়াশোনা করেন। পরে তিনি জানান, সেখানে থাকাকালে বড় ভাই উইলিয়াম তাকে উপেক্ষা করতেন বলে তিনি কষ্ট পেয়েছিলেন। এরপর হ্যারি অস্ট্রেলিয়া ও আফ্রিকায় এক বছর অবকাশ কাটান। লেসোথোতে অনাথ শিশুদের দেখাশোনা করেন। সেখানে তিনি ডায়ানার স্মরণে একটি দাতব্য সংস্থাও প্রতিষ্ঠা করেন। মানসিক আঘাতবিষয়ক বিশেষজ্ঞ গ্যাবর মাতে চলতি সপ্তাহে বিবিসিকে বলেন, ‘তার শৈশব খুব কঠিন ছিল।’ তিনি বলেন, ‘ সে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিল।’ এ সময় তিনি পরিবারে ‘আবেগগত ঘনিষ্ঠতার অভাবের’ কথাও উল্লেখ করেন। লম্বা ও ক্রীড়াবিদ হ্যারি রাগবি ও পোলো খেলতে পছন্দ করেন। তিনি এক দশক সামরিক বাহিনীতে কাজ করেন। এর মধ্যে দুই দফা আফগানিস্তানে দায়িত্ব পালন করেন। একবার হেলিকপ্টার পাইলট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৫ সালে তিনি সামরিক বাহিনী ছাড়েন। এর আগের বছর, ২০১৪ সালে, হ্যারি আহত সেনাসদস্যদের জন্য আন্তর্জাতিক ইনভিক্টাস গেমস প্রতিষ্ঠা করেন। এখনো প্রতি বছর এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। ২০১৮ সালে উইন্ডসর ক্যাসেলে হ্যারি ও মেগানের রূপকথার মতো বিয়ে সারা বিশ্বে সম্প্রচারিত হয়। এরপর তাদের উইলিয়াম ও কেটের সঙ্গে ‘ফ্যাব ফোর’ হিসেবে রাজপরিবারের ভবিষ্যৎ পুনরুজ্জীবনের সম্ভাবনা হিসেবে দেখা হচ্ছিল। পরের বছর তাদের ছেলে আর্চির জন্ম হয়। তবে ২০২০ সালের শুরুতেই তাদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা প্রকাশ্যে আসে। ওই সময় হ্যারি ও মেগান ব্রিটেন এবং রাজপরিবারের কর্মরত সদস্য হিসেবে দায়িত্ব ছেড়ে দেন।























































Discussion about this post